বহিষ্কারের পর সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুলের পদ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
ব্যক্তিগত জীবনের বিতর্কিত ঘটনা, দ্বিতীয় স্ত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যু এবং দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ বহাল থাকা নিয়ে চরম সাংবিধানিক ও আইনি ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নৈতিক স্খলনের দায়ে জামায়াতে ইসলামী তাঁকে দল থেকে বের করে দেওয়ার পর থেকেই দেশের আইন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই এমপির একটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এই ঘটনার পর গত ২২ জুলাই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে জামায়াত তাঁকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে। একইসাথে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও জাতীয় সংসদের স্পিকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয় দলটি। এর পরপরই সংসদ সদস্যের বাসভবন ন্যাম ভবন থেকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের ঘটনা পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করে তোলে। স্ত্রীর আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় বর্তমানে তিনি রিমান্ডে রয়েছেন।
আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সংসদ সদস্য তাঁর রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে কি না, সে ব্যাপারে সংবিধানে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। প্রখ্যাত সংবিধান বিশেষজ্ঞ কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গাজী নজরুল দলের বিপক্ষে ভোট দেননি বা নিজে পদত্যাগও করেননি। তাছাড়া, ৬৬ বা ৬৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত নৈতিক স্খলনের আওতায় পড়তে হলে আদালতের চূড়ান্ত রায়ে সাজাপ্রাপ্ত হতে হবে। তাই সার্বিক বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আইনি ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যার অবকাশ রয়েছে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দলটির সাথে গাজী নজরুলের আর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। দলের আইনজীবী শিশির মনির গণমাধ্যমকে জানান, রাষ্ট্র ও আইন অনুযায়ী যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটাই চূড়ান্ত; এখানে জামায়াতের আলাদা করে কিছু বলার নেই। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ স্পষ্ট করেছেন যে, এমপি পদ বাতিল বা বহাল রাখার এখতিয়ার সম্পূর্ণ স্পিকার ও সংসদ সচিবালয়ের। ইসি কেবল দাপ্তরিক নির্দেশনা পেলেই আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
সংবিধান বিশ্লেষকদের ধারণা, বহিষ্কৃত এমপির পদ বাতিল চেয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল যদি স্পিকার বরাবর লিখিত আবেদন করে, তবে স্পিকার সেটি নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে পারেন। এরপর ইসি আইনি দিক পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। আবার অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্পিকার চাইলে নিজ ক্ষমতাবলেও ইসিকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারেন।
সার্বিক এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এই এমপির এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে পুরো জাতীয় সংসদের অবমাননা হয়েছে এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যদের সম্মানও চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংসদীয় রাজনীতির পবিত্রতা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে সচেতন নাগরিক সমাজ স্পিকারের কাছ থেকে একটি দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছে।
